১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এসএসসির ফল, ফেল ৬ লাখ ৯০ হাজার
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের পতন হয়েছে। এবার ১১ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবার মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। ফলে ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। গত বছরের তুলনায় ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
এর আগে ২০০৭ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর এবারই পাসের হার এত নিচে নামল।
জিপিএ-৫ কমেছে ২২ হাজার
এবার ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। পাস করা মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর হার ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। গতবারের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
ফলাফলে দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় সামগ্রিক পাসের হারে বড় প্রভাব পড়েছে। বিপরীতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে প্রায় সব বোর্ডেই পাসের হার ৯৮ শতাংশের বেশি। বাংলা, ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিষয়েও তুলনামূলক ভালো ফল হয়েছে।
মানবিকে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে
বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। অন্যদিকে মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
অর্থাৎ মানবিক বিভাগের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
টানা আট বছর ছেলেদের পেছনে মেয়েরা নয়, মেয়েরাই এগিয়ে
এবারও পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুই ক্ষেত্রেই মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ৯ লাখ ১১ হাজার ৭৯১ জন ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন। তাদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
অন্যদিকে ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৪ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন। ছেলেদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
এবার ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে। বিপরীতে ছাত্রদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫২ হাজার ৭৮০ জন। অর্থাৎ ছেলেদের তুলনায় ১১ হাজার ১১৬ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত আট বছর ধরে মাধ্যমিকের ফলাফলে পাসের হারে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে।
৩১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি
এবার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
এর মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২২৬টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৮৬টি।
অন্যদিকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে—এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার কমে ৬৬৯টিতে নেমেছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৯৮৪টি।
কেন ফল বিপর্যয়
ফল বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চলছে নানা বিশ্লেষণ। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, ইংরেজি ও গণিতে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করায় এবার সামগ্রিক পাসের হার কমেছে। বিশেষ করে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্যের হার বেশি।
শিক্ষাবিদেরা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা নতুন নয়। কেন শিক্ষার্থীরা এসব বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে, তা মাঠপর্যায়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীদের গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে ফেলের হার বেড়েছে। মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত সময় কাটানোও পড়াশোনায় মনোযোগ কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফলে শীর্ষে ঢাকা
১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে রাজশাহীতে ৬৩ দশমিক ৬৭, কুমিল্লায় ৬৫ দশমিক ৪২, যশোরে ৬৬ দশমিক ২৭, চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮, বরিশালে ৬০ দশমিক ৩৫, সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক ০৫ এবং ময়মনসিংহে ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিলে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সবচেয়ে কম পাসের হার ময়মনসিংহ বোর্ডে। এ বোর্ডে ইংরেজিতে পাস করেছে ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং গণিতে ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী।
জিপিএ-৫-এর হারে রাজশাহী, সংখ্যায় ঢাকা
জিপিএ-৫ পাওয়ার হারে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে এগিয়ে রয়েছে রাজশাহী। এ বোর্ডে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৬ হাজার ১১৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। জিপিএ-৫ পাওয়ার হার ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ।
সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। এ বোর্ডে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ১৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৩ হাজার ২৫৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ হার ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
এবার বিদেশে থেকেও এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৪০২ জন। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৩৫৪ জন।
একাদশে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার সম্ভাবনা
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে আসন্ন শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন গ্রহণের পর মেধা ও পছন্দক্রমের ভিত্তিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
তবে এবার পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় একাদশ শ্রেণিতে প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।