ফেনীতে ১০২ জাতের আমের ব্যতিক্রমী বাগান, কোটি টাকার বিক্রির আশা
ফেনীর সোনাগাজীতে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমধর্মী আমের বাগান, যেখানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে চাষ হচ্ছে ১০২ জাতের আম। ফেনী নদীর তীরবর্তী মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকায় ৬৫ একরজুড়ে গড়ে ওঠা ‘সোয়াস এগ্রো কমপ্লেক্স’-এ রয়েছে প্রায় ৬ হাজার আমগাছ। চলতি মৌসুমে এ বাগান থেকে প্রায় ১০০ টন আম বিক্রির আশা করা হচ্ছে, যার বাজারমূল্য এক কোটি টাকারও বেশি।
বাগানটির অন্যতম বিশেষত্ব হলো, শুধু আমের মৌসুমেই নয়, বছরের প্রায় প্রতিটি ঋতুতেই এখানে কোনো না কোনো জাতের আম পাওয়া যায়। দেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলের জনপ্রিয় জাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের বিভিন্ন জাতের আমের চাষ হচ্ছে এ বাগানে।
খামারের প্রতিষ্ঠাতা অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. সোলায়মান জানান, ১৯৮৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু পালন, মধু উৎপাদন ও নার্সারি ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা অর্জনের পর ১৯৯২ সালে মাত্র তিন লাখ টাকা পুঁজি এবং ছয় একর জমি নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর সেই উদ্যোগ ৬৫ একরের সমন্বিত কৃষি খামারে রূপ নিয়েছে।
তিনি জানান, চলতি মৌসুমে খামার থেকে ৯০ থেকে ১০০ টন আম উৎপাদনের আশা করছেন। সাধারণ জাতের আম প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং বিশেষ কিছু জাতের আম, যেমন ব্যানানা ম্যাঙ্গো, প্রতি কেজি ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গড়ে প্রতি কেজি ১০০ টাকা ধরে মোট বিক্রির পরিমাণ এক কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
মেজর সোলায়মান বলেন, “আম বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হয় না। ক্রেতারাই সরাসরি খামারে এসে আম সংগ্রহ করেন। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আম পাঠানো হয়।”
তিনি আরও জানান, বাগানে কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। সারাবছর জৈব সার প্রয়োগ করা হয় এবং মুকুল আসার প্রায় দুই মাস আগে প্রয়োজন অনুযায়ী একবার কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে খামারটিতে ২৫ জন স্থায়ী এবং ১০ জন দৈনিকভিত্তিক শ্রমিক কাজ করছেন।
মিরসরাই থেকে আসা ক্রেতা মাঈন উদ্দিন বলেন, “এখানকার আম নিরাপদ ও মানসম্মত। তাই পরিবারের জন্য সরাসরি খামারে এসে আম কিনে নিয়ে যাচ্ছি।”
খামারের ব্যবস্থাপক ও সাবেক সেনাসদস্য হেলাল হোসেন বলেন, “সম্পূর্ণ জৈবিক ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত আমের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ক্রেতা খামারে এসে আম সংগ্রহ করছেন।”
খামারের কর্মচারী মো. নাহিদ জানান, প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ কেজি আম বিক্রি হচ্ছে এবং অধিকাংশ ক্রেতাই সরাসরি বাগান থেকে আম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. হানিফ বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কারিগরি সহযোগিতায় খামারটিতে জৈবিক ও ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম উৎপাদন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এখানকার আম বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আতিক উল্যাহ বলেন, চলতি মৌসুমে এ খামার থেকে প্রায় ১০০ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যাগিং পদ্ধতির ব্যবহার আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মেজর (অব.) সোলায়মানের এই উদ্যোগ শুধু একটি সফল খামারের গল্প নয়, বরং দেশের তরুণদের জন্য কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার এক অনুপ্রেরণার উদাহরণ।