ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা নেই, চার বছরে কমেছে ১ লাখ টন
পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে জাতীয় মাছ ইলিশের আহরণ। উৎপাদন কমার কারণ অনুসন্ধান ও সংকট কাটাতে বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালীতে চার মাসব্যাপী সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করেছে মৎস্য অধিদপ্তর।
জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—সাধারণত এই তিন মাসকে ইলিশের ভরা মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু চলতি মৌসুমেও নদ-নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাচ্ছেন না জেলেরা। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মাত্র চার বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশ আহরণ কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন।
ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ খুঁজতে এবং উৎপাদন বাড়ানোর উপায় বের করতে চার মাসব্যাপী সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। শনিবার দ্বীপ জেলা ভোলার মনপুরা উপজেলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়।
দক্ষিণাঞ্চলে পরিচালিত এই সমীক্ষা দলের সদস্য মৎস্য বিশেষজ্ঞ আতিকুল ইসলাম বলেন, মা ইলিশ ও জাটকা কীভাবে সংরক্ষণ করা যায় এবং ইলিশের উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো সম্ভব—সমীক্ষায় সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি নদীতে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র পরিদর্শন, মাছ আহরণের পরিস্থিতি এবং জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের সম্ভাব্য উপায়ও খোঁজা হবে।
সমীক্ষার অংশ হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা, জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলবে দলটি।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চার মাসব্যাপী এই সমীক্ষার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মৎস্যবিজ্ঞানী ও গবেষক অধ্যাপক ড. মো. নিয়ামুল নাসের। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান।
শনিবার থেকে টানা নয় দিন সমীক্ষা দল ভোলার মনপুরা ও চরফ্যাশন, বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া, মহিপুর ও আলীপুর পরিদর্শন করবে। এসব এলাকার মৎস্যঘাট, বাজার, ব্যবসায়ী ও জেলেদের কাছ থেকে তথ্য ও মতামত সংগ্রহ করা হবে।
তিন বছর ধরেই কমছে উৎপাদন
ইলিশের উৎপাদন হঠাৎ কমেনি। প্রায় পাঁচ বছর ধরেই ধীরে ধীরে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশের উৎপাদন ছিল সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন।
এর পর থেকে প্রতিবছরই উৎপাদন কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে হয় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে।
অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে বরিশাল বিভাগে ইলিশ আহরণ কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
মোকামে নেই আগের সেই ইলিশ
ইলিশের সংকটের চিত্র স্পষ্ট বরিশালের পোর্ট রোড মোকামেও। মৌসুমে যেখানে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মণ ইলিশ আসত, সেখানে গত শুক্রবার সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৬০ মণ।
মোকামের লিয়া আড়তের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, বর্ষা হলেও নদীতে ইলিশ মিলছে না। শুক্রবার বড় আকারের ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৭৫০ টাকা, জাটকা ২ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও এই সময়ে মোকামে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইলিশ আসত। এখন মাছের অভাবে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কেন কমছে ইলিশ?
ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা জানিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূলীয় অঞ্চল অধ্যয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হাফিজ আশরাফুল হক।
তাঁর মতে, ইলিশ মূলত স্রোতের মাছ। কিন্তু বিভিন্ন নদীর চ্যানেল নাব্যতা হারানোয় সাগর থেকে নদীতে প্রবেশের সময় মোহনায় পর্যাপ্ত পানি ও স্রোত পাওয়া যাচ্ছে না। খরায় অনেক নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর ফলে ইলিশের আকার ছোট হয়ে যাওয়া এবং অপরিণত অবস্থায় ডিম ছাড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ধারণা, গত ১০ বছরে ইলিশের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
সমীক্ষা দলের দায়িত্বে থাকা ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. আনিছুর রহমান বলেন, ইলিশের বর্তমান সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। সংকটের কারণ চিহ্নিত করে তা দূর করার উপায় খুঁজতেই সমীক্ষা দল কাজ করবে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, বৃষ্টি বাড়লে সাধারণত ইলিশ আহরণও বাড়ার কথা। কিন্তু মেঘনা, কালাবদর, ইলিশা ও কীর্তনখোলা নদীতে এখনো প্রত্যাশিত পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজতেই সমীক্ষা দল কাজ করছে।
ইলিশের উৎপাদন কমার প্রকৃত কারণ কী এবং এই সংকট থেকে উত্তরণের পথই বা কী—চার মাসের সমীক্ষায় তার উত্তর কতটা পাওয়া যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।