৫২ কিলোওয়াটে ১১৯ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ! বগুড়ার ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
৫২ কিলোওয়াটে ১১৯ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ! বগুড়ার ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি নিয়ে উঠছে প্রশ্ননিজস্ব প্রতিবেদকসারা দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে আলোচনায় এসেছে বগুড়ার শেরপুরের পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি। দাবি করা হচ্ছে, জ্বালানি খরচ কমিয়ে প্রতি ইউনিটে মাত্র দেড় টাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তবে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, গবেষণার কৃতিত্ব ও মালিকানা নিয়ে ইতিমধ্যে উঠেছে নানা প্রশ্ন।আরডিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে পাঁচ সদস্যের একটি দল এ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছে। দলের প্রধান আরডিএর উপপরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম। সদস্য হিসেবে রয়েছেন আরডিএর মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক, পরিচালক মো. ফেরদৌস হোসেন খান এবং বগুড়ার বানদীঘি গ্রামের উদ্যোক্তা মতিয়ার রহমান সরকার ও মিজানুর রহমান।তবে উদ্যোক্তা মতিয়ার রহমান ও মিজানুর রহমানের দাবি, আরডিএর গবেষণা শুরুর অনেক আগেই তাঁরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ফ্লাইহুইল নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁদের ভাষ্য, ২০০৪ সালে মতিয়ার রহমান ছোট আকারের ফ্লাইহুইলের প্রোটোটাইপ তৈরির কাজ শুরু করেন। পরে বিদ্যুৎ কৌশলে ডিপ্লোমাধারী মিজানুর রহমান এ কাজে যুক্ত হন।মতিয়ার রহমান বলেন, ইনকিউবেটরে কম বিদ্যুৎ খরচে বড় ভর ঘোরানোর বিষয়টি থেকেই ফ্লাইহুইল নিয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের অর্থ, শ্রম ও সময় ব্যয় করে তাঁরা গবেষণা চালিয়ে যান।তাঁর দাবি, চলতি বছরের ১৮ মে তিনি আরডিএতে গিয়ে গবেষণাটির জন্য সরকারি সহায়তা চেয়ে একটি প্রোফাইল তৈরির অনুরোধ করেন। এরপর আরডিএর কর্মকর্তারা তাঁদের গবেষণাগার পরিদর্শন করেন এবং প্রযুক্তিটি বড় পরিসরে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। তবে এখন পর্যন্ত গবেষণার কারিগরি উন্নয়ন বা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য আরডিএ কোনো অর্থ দেয়নি বলে দাবি করেন তিনি।মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ২২ বছরের প্রচেষ্টায় তাঁদের প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ হয়েছে। তাই এখন এই গবেষণার কৃতিত্ব আরডিএর দাবি করা দুঃখজনক।অন্যদিকে আরডিএর উপপরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, ২০১৪ সাল থেকেই তাঁদের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের যৌথভাবে গবেষণা চলছে। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত চুক্তি হয়নি। গবেষণা পরিচালনা, অর্থায়ন কিংবা প্রযুক্তির মালিকানা নিয়েও কোনো আনুষ্ঠানিক দলিল করা হয়নি বলে তিনি জানান।প্রযুক্তিটির পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় ৫২ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি প্রাইম মুভার দিয়ে ৬০০ ও ১ হাজার কেজি ওজনের দুটি ফ্লাইহুইল প্রায় ১ হাজার ৪০০ আরপিএম গতিতে ঘোরানো হয়। পরে গিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে গতি কমিয়ে প্রায় ২৫০ আরপিএমে আনা হয়। এর সঙ্গে ২৪-পোলের স্থায়ী চুম্বক জেনারেটর যুক্ত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।গবেষকদের দাবি, পরীক্ষায় প্রায় ৬০০ ভোল্ট ও ৫০ হার্জ বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে তা ৪০০ ভোল্টে রূপান্তর করে প্রায় ১১৯ কিলোওয়াট বাস্তব লোড চালানো সম্ভব হয়েছে। গত ১৬ আগস্ট বগুড়ার এরুলিয়ার বানদীঘি এলাকায় পরীক্ষামূলক প্ল্যান্টে দুটি পাম্প ও একটি ওয়েল্ডিং মেশিন চালিয়ে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা দেখানো হয়।তবে এই দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারসিম মান্নান মোহাম্মদী। তাঁর মতে, কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থায় মোট আউটপুট শক্তি মোট ইনপুট শক্তির চেয়ে বেশি হতে পারে না। তাই প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাইয়ে ইনপুট ও আউটপুটের ভোল্টেজ, কারেন্ট, পাওয়ার ও সময় স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিমাপ করা প্রয়োজন।আরডিএর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. আব্দুল মজিদও বলেন, এই গবেষণায় সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি; উদ্যোক্তারাই ব্যক্তিগতভাবে অর্থ ব্যয় করেছেন। আরডিএর গবেষক দল তাঁদের সহযোগিতা করেছে। তাঁর ভাষ্য, ‘জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ’—এভাবে বিষয়টি প্রচার করা ঠিক নয়; বরং লক্ষ্য হচ্ছে স্বল্প ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি উন্নয়ন।এদিকে প্রযুক্তিটিকে বড় পরিসরে পরীক্ষার জন্য ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জলবায়ু-সংকটাপন্ন অঞ্চলে টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহে সাশ্রয়ী ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে প্রকল্প নেওয়ার আগে প্রযুক্তিটির শক্তি উৎপাদন, ব্যয় সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণার কৃতিত্ব ও মালিকানা নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় বিষয়টি আরও যাচাইয়ের দাবি রাখে।