ঢাকা    সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
RTN News

লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাব, জর্ডানের দুই ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

দক্ষিণ ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলার পর, জর্ডানে থাকা দুই মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইরান। স্থানীয় সময় গতকাল রোববার রাতে এই হামলা হয়। মার্কিন হামলায় সেনা হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থাগুলোতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, ‘আগ্রাসনকারীকে শাস্তিদান’ (Punishment of the Aggressor) নামের এই যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় জর্ডানের কিং হোসেন এবং আল আজরাক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।জুলাই মাসে এক সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে সংঘাত আপাতত বন্ধ হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে এই প্রথম পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল। দ্বীপটির কাছে বিকট বিস্ফোরণের খবর প্রথম প্রকাশ করে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি। পরে আইআরজিসি জানায়, এই হামলায় বেশ কয়েকজন সেনা সদস্য হতাহত হয়েছেন। ফার্স নিউজ জানায়, ‘আমেরিকান-জায়োনিস্ট (কট্টর ইহুদিবাদী ইসরায়েলি) শত্রুর’ এই হামলায় সেনা হতাহত হয়েছে, তবে সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা দেওয়া হয়নি।এদিকে, আইআরজিসি দাবি করেছে—জর্ডানে তাদের এই হামলায় ঘাঁটির কারিগরি ও মেরামতের অবকাঠামোর পাশাপাশি শত্রুপক্ষের ফাইটার বিমান মোতায়েন কেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে কোনো ঘাঁটিতেই হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘হরমুজ প্রণালির ওপর ইসলামী প্রজাতন্ত্রের (ইরানের) নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার চেষ্টায় শত্রুর যে হতাশা তৈরি হয়েছে, আক্রমণ ও অপরাধ করে তার কোনো সমাধান হবে না। প্রতিটি আক্রমণের জবাব আরও ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া দিয়ে দেওয়া হবে।’ এর আগে লারাক দ্বীপে রোববারের হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল তেহরান।যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরান যুদ্ধ সপ্তম মাসে পড়ার প্রেক্ষাপটে, ওয়াশিংটন যখন তেহরানের ওপর সামরিক অভিযানের বদলে আর্থিক চাপ সৃষ্টির কৌশল বাড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই এই পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন করে সামরিক সংঘাত বাড়িয়ে তোলার ঝুঁকি তৈরি করেছে।আল জাজিরাকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার লক্ষ্য ছিল লারাক দ্বীপে রাখা সেইসব উৎক্ষেপক কেন্দ্রগুলো (লঞ্চার সেন্টারস), যেখান থেকে হরমুজ প্রণালিতে মাইন বহনে সক্ষম রকেট ছোড়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটন দাবি করে আসছে যে, ইরানের অবরোধ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক পাহারায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে লাখ লাখ ব্যারেল তেল পার পারাপার করা হচ্ছে এবং এই জলপথের ওপর যুক্তরাষ্ট্রেরই নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তা সত্ত্বেও, এই প্রণালীতে জাহাজের ওপর প্রায় প্রতিদিনই হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, জলপথটি বন্ধ রয়েছে।রোববারের হামলাগুলো প্রমাণ করে যে, তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতি স্বীকার করানো এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের দাবি আদায়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরও যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে প্রস্তুত। এর আগেও মার্কিন হামলার জবাবে ইরান তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল।গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা বিভিন্ন দেশ ও কোম্পানির ওপর পরোক্ষ বা দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার (secondary sanctions) হুমকি দিয়ে ইরানকে আর্থিকভাবে একঘরে করার উদ্যোগের ঘোষণা দেয়।তবে পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেও প্রস্তুত। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করে আসছেন যে, হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ উঠে গেছে এবং তাদের বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান অর্থনৈতিক ধসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।তবে তেহরানও তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে এবং তারা দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের জন্য তৈরি বলে জোর দিয়ে জানিয়েছে। শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ তেল পারাপারের খবর খারিজ করে দেন।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘আমাদের কাছে থাকা গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে বড় ধরনের চক্রান্ত চলছে। মার্কিন সরকারের কিছু অংশ নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থে তেলের দাম ওঠানামা করাতে সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করছে এবং (ট্রাম্পকে) এই হেরে যাওয়া যুদ্ধে আটকে রাখছে। পাশাপাশি ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোও মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে যুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছে। তবে প্রকৃত আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদেরই পোহাতে হচ্ছে।’কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও, যোগানের অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম চড়া রয়ে গেছে।ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সময় পেট্রোলের প্রতি গ্যালনের (৩.৮ লিটার) গড় দাম ছিল ৩ ডলারেরও কম, যা এখনো যুক্তরাষ্ট্রে ৪ ডলারের ওপরেই রয়েছে। জ্বালানির চড়া দাম যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় বাঁধা হতে পারে।

লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাব, জর্ডানের দুই ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা