খরচ বাঁচাতে বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ, ঈশ্বরদীর শতাধিক চাতালে পরিবেশ ও কৃষির ক্ষতির অভিযোগ
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় খরচ কমাতে পলিথিন, পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিক-রাবারের জুতা-স্যান্ডেলসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করছেন চালকল ও চাতাল মালিকরা। উপজেলার শতাধিক হাস্কিং মিলে প্রকাশ্যে এই চর্চা চললেও অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি কৃষিজমি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন চাতালের বয়লার থেকে ঘন কালো ধোঁয়া ও তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। ধোঁয়া ও ছাই আশপাশের বসতবাড়ি, গাছপালা এবং আবাদি জমির ওপর জমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কালো ধোঁয়া ও উড়ে আসা ছাইয়ের কারণে ফল-ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।মিল মালিকদের ভাষ্য, ঈশ্বরদীর রূপপুর প্রকল্প ও ইপিজেড এলাকার বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে স্বল্পমূল্যে বর্জ্য সংগ্রহ করা যায়। ধানের তুষ বা অন্যান্য জ্বালানির তুলনায় এসব বর্জ্য ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় কম পড়ে। তাই অনেকেই বর্জ্যকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আইকে রোড, জয়নগর, সাকড়েগাড়ি, ভেলুপাড়া ও রূপপুর গ্রীনসিটি সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করা হচ্ছে। বারবার আপত্তি জানানো হলেও চাতাল মালিকরা তা আমলে নিচ্ছেন না।আইকে রোড এলাকার ব্যবসায়ী মঞ্জুর রহমান বলেন, বর্জ্য পোড়ানোর ছাই বাড়িঘর, টিনের চাল, আসবাবপত্র, বিছানা ও কাপড়ে জমে যায়। প্রতিদিনই এ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক চালকল ও হাস্কিং মিলে নিয়মিত টায়ার, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করা হচ্ছে, যা পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন চাতাল মালিক বলেন, তুষের দাম বেশি হওয়ায় তারা কম খরচের বিকল্প হিসেবে শিল্পবর্জ্য ব্যবহার করছেন।ঈশ্বরদী উপজেলা চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি হাজী শামসুল আলম বলেন, সমিতির পক্ষ থেকে একাধিকবার বর্জ্য ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানানো হলেও অনেক মালিক তা মানছেন না।বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ বলেন, কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমছে।পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, প্লাস্টিক, টায়ার ও রাবারজাতীয় বর্জ্য পোড়ানোর ফলে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি এবং পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় কমিটির সদস্য সহিদ মাহমুদ বলেন, এতে চালের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর 'সবুজ পৃথিবী' ঈশ্বরদী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বাবু বলেন, এভাবে চলতে থাকলে উপজেলার পরিবেশ আরও ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে।পাবনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (দপ্তর প্রধান) মো. আব্দুল গফুর বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি কারখানা ও চাতালে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। যারা গোপনে বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আবারও অভিযান চালানো হবে।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, অভিযোগ পাওয়া চাতালগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে পরিবেশ দূষণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।