নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা, নিহত ১৫৭; নিখোঁজ শত শত
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা, নিহত ১৫৭; নিখোঁজ শত শতনেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৫৭ জন নিহত হয়েছেন। প্রবল পানির স্রোতে কয়েকটি গ্রাম, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।বন্যার পর নেপালে প্রায় ৪০৩ জন পর্যটকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে দেশটির পর্যটন মন্ত্রণালয়। তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও রয়েছেন।নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবিনারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, নিখোঁজদের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।তিব্বতেও হতাহত ও নিখোঁজসীমান্তের অপর পাশে চীনের তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে অন্তত তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হতাহতের সংখ্যা এখনো যাচাই করা হচ্ছে।রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গিয়িরং এলাকায় ভূমিধসে চীন-নেপাল স্থলসীমান্তের একটি পারাপারের পথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গিয়িরং বন্দরও। এতে শিগাতসে অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় নজরদারি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।পানির স্রোতে ভেসে গেছে গ্রামনেপালের পাহাড়ি জেলা রাসুয়ার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় বন্যার পানির উচ্চতা এতটাই বেড়ে যায় যে সেখানে হেলিকপ্টারও অবতরণ করতে পারেনি। ওই এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করেন।জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার ভোতে কোশি নদীর তীরে বসবাসকারীদের দ্রুত উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আশপাশের কয়েকটি গ্রাম ও বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প পানির প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।নেপাল সরকারের মুখপাত্র স্মিত পখরেল জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য ভারত ও চীনের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দুর্যোগের পর সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। উদ্ধার, চিকিৎসা, খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব সরকার নিয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।দুর্যোগ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের জরুরি বৈঠক করেছেন। চিকিৎসক দল, স্কাউট ও রেডক্রসের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও বড় ক্ষতিবন্যায় নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে।এদিকে নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। আরও ১০ জন সেখানে আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিখোঁজ ও আটকে পড়া ব্যক্তিরা কোরিয়া এনার্জি ও দুসান এনার্জিবিলিটি কোম্পানির কর্মী।দক্ষিণ কোরিয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। নেপালে সরকারি কর্মকর্তা, অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে দ্রুত-প্রতিক্রিয়া দল পাঠানোর পরিকল্পনাও করছে দেশটি।ভারতেও সতর্কতানেপালের ভয়াবহ বন্যার প্রভাব ভারতের বিহারেও পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যার পানি ওই অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিহারের ছয়টি জেলা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন এক ভারতীয় কর্মকর্তা।নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে। নিখোঁজদের সন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা।নেপালের জলবায়ু ন্যায়বিচারকর্মী প্রয়াশ অধিকারী এই পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, পানির প্রবল স্রোতে পুরো গ্রাম পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভবন, স্কুল, সেতু ও মহাসড়কও ধ্বংস হয়েছে।রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রকাশিত রিপাবলিকা ডেইলির সম্পাদক কোশ রাজ কৈরালা বলেন, আকস্মিক বন্যার সময় স্থানীয় মানুষ প্রস্তুত ছিলেন না। ভারী বৃষ্টিপাত না থাকায় অনেকেই নিজেদের বাড়িতেই ছিলেন। পরে নদীর প্রবল স্রোতে একের পর এক বাড়ি ভেসে যায়।
নেপাল পুলিশ ও অন্যান্য সূত্রের প্রকাশিত ভিডিওতে পাহাড়ি উপত্যকার মধ্য দিয়ে কাদামাটিতে ভরা প্রবল স্রোতে পানি ছুটে যেতে দেখা গেছে।