ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩
RTN News

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে নতুন উদ্যোগ, ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় সম্মত পুতিন

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে নতুন উদ্যোগ, ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় সম্মত পুতিনইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় আগামী মাসে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা শুরুর বিষয়ে সম্মত হয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বুধবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর ক্রেমলিন এ তথ্য জানিয়েছে। সম্ভাব্য আলোচনার স্থান হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির নাম উঠে এসেছে। আগামী ১০ নভেম্বর বা এর পরে আলোচনা শুরু হতে পারে।বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগ এমন সময়ে এল, যখন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে শান্তিচুক্তির শর্ত নিয়ে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। নতুন আলোচনায় সম্মতি দিলেও যুদ্ধের লক্ষ্য থেকে সরে আসার স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত দেননি পুতিন।পুতিন-উইটকফের বৈঠক প্রায় তিন ঘণ্টাবুধবার সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি রাজকীয় প্রাসাদে পুতিন ও উইটকফের বৈঠক প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে। পুতিনের সঙ্গে এটি ছিল মার্কিন বিশেষ দূতের নবম সরাসরি বৈঠক।বৈঠকের শুরুতে সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে রাশিয়ায় আটক অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন স্কুলশিক্ষক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার জন্য পুতিনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন ট্রাম্প।ক্রেমলিনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হবে কারিগরি পর্যায়ে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে সেখানে আলোচনা হওয়ার কথা। তবে আলোচনার কাঠামো, অংশগ্রহণকারীদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কিংবা চূড়ান্ত সমঝোতার সম্ভাব্য রূপরেখা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।যুদ্ধ বন্ধে কিয়েভের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন ট্রাম্পইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন ট্রাম্প। একসময় তিনি দাবি করেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির দুই বছরেরও বেশি সময় পরও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।সম্প্রতি ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়িয়ে ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধ করার সময় এসেছে। অন্যথায় দেশটিকে ‘খুব খারাপ পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে হবে।তবে শান্তিচুক্তির শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান এখনো অনেক। পুতিনের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি সম্পাদন। এসব শর্ত মেনে নেওয়ার বিষয়ে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট সম্মতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত শুরু হলে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি আর এগোয়নি। নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের বৃহত্তর বৈদেশিক নীতির চ্যালেঞ্জও সামনে এনেছে।অসলো বৈঠকের প্রস্তাবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় মস্কোপুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আগের দিন অসলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতাদের পাশাপাশি ইউরোপীয় ও ন্যাটোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন উইটকফ।তিনি পুতিনকে জানান, অসলো বৈঠকে আলোচনায় কিছুটা গতি এসেছে। এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে ইউক্রেন নতুন কিছু ধারণা ও প্রস্তাব তুলে ধরেছে। তবে এসব প্রস্তাবে মস্কো পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়।পুতিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, অসলো আলোচনার কিছু বিষয় রাশিয়ার প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি।অন্যদিকে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে পুতিন ও ট্রাম্পের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আলোচনা করতে চান তিনি। তবে ক্রেমলিনের অবস্থান হলো, পুতিন ও জেলেনস্কির সরাসরি বৈঠকের আগে দুই নেতার সহযোগীদের বিস্তারিত প্রস্তুতি নিতে হবে, যাতে সম্ভাব্য বৈঠকটি বাস্তবসম্মত ও ফলপ্রসূ হয়।যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্কে বাড়ছে টানাপোড়েনরাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক যোগাযোগ ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করেছে। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল রপ্তানিবিষয়ক একটি চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এর পর দুই দেশের সম্পর্কে অবনতি ঘটে।ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটিতে জ্বালানির দাম বেড়েছে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা নির্বাচন সামনে রেখে এ পরিস্থিতি ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।ডিজেল চুক্তির পর ইউক্রেন অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ব্যাহত হয়েছে। সামরিক যোগাযোগে ব্যবহৃত স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার ব্যবহারেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, মঙ্গলবার অসলো বৈঠকে এসব সমস্যা সমাধানের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।এদিকে মার্কিন কর্মকর্তাদের ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে বুধবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইলন মাস্ক ইউক্রেনের সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্পেসএক্সের স্টারলিংক সেবার একটি সংস্করণের কার্যক্রম ধীর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও সেগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ইউক্রেন এই সেবার ওপর নির্ভর করে।তবে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেদনটি যাচাই করতে পারেনি। ইলন মাস্ক বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা মার্কিন সামরিক বাহিনী অথবা প্রেসিডেন্ট নিয়ে থাকেন। ট্রাম্পও এ বিষয়ে তাঁর কোনো দায় নেই বলে জানিয়েছেন। বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পুনর্ব্যক্ত করেন, ওয়াশিংটন ইউক্রেনের স্টারলিংক ব্যবহারের সক্ষমতা প্রত্যাহার করেনি।শান্তিচুক্তির পথে এখনো বড় বাধাত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরুর বিষয়ে পুতিনের সম্মতি ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক উদ্যোগে অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হলেও ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এখনো অনিশ্চিত। ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ, ন্যাটো সদস্যপদ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তার মতো মৌলিক প্রশ্নে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থান বিপরীতমুখী।একই সঙ্গে ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা শান্তি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।আবুধাবিতে সম্ভাব্য আলোচনা শুরু হলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, দুই পক্ষ নিজেদের মৌলিক দাবিতে কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত। আপাতত আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি হলেও এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে বাস্তবসম্মত সমঝোতার ওপর। সূত্র: রয়টার্স

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে নতুন উদ্যোগ, ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় সম্মত পুতিন