ঢাকা    রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
RTN News

নেপালের হড়পা বান: প্রকৃতির রুদ্ররূপ নাকি মানুষেরও দায়?

নেপালের হড়পা বান: প্রকৃতির রুদ্ররূপ নাকি মানুষেরও দায়?গত বুধবার ছিল ছুটির দিন। বৃহস্পতিবার কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। তবে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের দৃশ্য দেখে বিস্মিত হচ্ছিলাম। প্রকৃতির রুদ্ররূপ যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, ২৬ আগস্টের সেই দৃশ্যগুলো যেন তারই নির্মম উদাহরণ।প্রথমদিকে ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজটি দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, এটি হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কোনো ভিডিও। বিরাট সাদা বহুতল ভবনের সামনে পিঁপড়ের মতো ছুটছিল মানুষ। ভবনের পাশে সারি করে রাখা বাসগুলোও কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ স্রোতের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, ভবনের পেছন দিক থেকে সাপের ফণার মতো উঠে আসে বিশাল ধূসর জলরাশি। মুহূর্তেই আছড়ে পড়ে চারপাশে। ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সেতু, গাছপালা ও সড়ক। পাহাড়ের পাথর, কাদা ও পানিতে তলিয়ে যায় পুরো এলাকা।সাদা সেই ভবনটি ছিল গাইরং পোর্ট—কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। নেপালের কাঠমান্ডু থেকে রসুয়াগাধি সীমান্ত পার হয়ে যাত্রীরা এই পথেই চীনের তিব্বতে প্রবেশ করেন। এরপর সাগা হয়ে মানস সরোবর ও কৈলাস পর্বতের বেস ক্যাম্প দারচেনের দিকে যাত্রা করেন। ট্রেকিংয়ের মৌসুম হওয়ায় ওই এলাকায় কাঠমান্ডু থেকে যাওয়া অনেক পর্যটক অবস্থান করছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও ছিলেন। আচমকা নেমে আসা প্রবল পানির স্রোত, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের তোড়ে তাঁদের অনেকেই নিখোঁজ হন।২৯ আগস্টের প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ৫৮৯ এবং নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকারী দল ও সামরিক হেলিকপ্টার কাজ করছে।হঠাৎ কেন এমন ভয়াবহ বন্যা?নেপালের রাসুয়া জেলা কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে। এই জেলার মধ্য দিয়েই তিব্বত থেকে প্রবেশ করেছে ভোতে কোশি নদী। স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার কিছু পর আচমকাই নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। অথচ তখন আকাশ ছিল পরিষ্কার, বৃষ্টির কোনো লক্ষণও ছিল না।এরপর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে ভয়াবহ বিপর্যয়।প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প, তুষারধস এবং পাহাড়ি নদীর গতিপথে পাথর ও বরফের স্তূপ জমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। নেপালের পার্লামেন্টে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের দিকে একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এরপর তুষারধস এবং তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই হড়পা বান নামে।ভূবিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথর ও বরফের স্তূপ নদীর গতিপথ আটকে দেওয়ার পর হঠাৎ সেই বাধা ভেঙে ভয়াবহ পানির স্রোত সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে আরও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও কি বাড়ছে?এই বিপর্যয়কে শুধু বিচ্ছিন্ন একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমালয়ের হিমবাহ ও বরফ দ্রুত গলছে—এ নিয়ে বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছেন। বরফ গলার পানি, অতিবৃষ্টি, তুষারধস ও হিমবাহ-সম্পর্কিত ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করলে পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বাড়তে পারে।হিমালয়ের সরু গিরিখাত দিয়ে নদীগুলো প্রবাহিত হওয়ায় পানির স্রোত সেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়। সেই পানি শুধু পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না; ভাটির দিকে নেমে আসে এবং শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়। ২০০৮ সালে ভোতে কোশির পানির সঙ্গে সম্পর্কিত বন্যা ভারতের বিহারেও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।অথচ ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও নদীতীর ও পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ থামছে না। দুর্যোগ মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।সতর্কবার্তা কি যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল?নেপালে এবারই প্রথম এমন হড়পা বান নয়। গত বছরের ৮ জুলাইয়ের বন্যায় সেখানে ৯ জন নিহত ও ১৯ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। এরপর ভূতাত্ত্বিক ও আবহাওয়াবিদেরা ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন সংস্থা ভোতে কোশি ও লেন্দে অঞ্চলকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।তারপরও যদি ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর ও পাহাড়ি এলাকায় জনবসতি ও বহুতল ভবন গড়ে ওঠে, তাহলে শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না।তিব্বতেও নতুন আশঙ্কানেপালের বিপর্যয়ের মধ্যেই নেপাল-চীন সীমান্তসংলগ্ন তিব্বত অঞ্চলে নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সেখানে ‘লেভেল-৪’ দুর্যোগ সতর্কতা জারি করেছে।চীনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিধসের পর দুটি নদীর মিলনস্থলে একটি প্রাকৃতিক জলাধার বা ‘ব্যারিয়ার লেক’ তৈরি হয়েছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি জমেছে এবং বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতিরিক্ত পানির চাপে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গেলে নিচের বিস্তীর্ণ এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সতর্কতাকে গুরুত্ব দেওয়া। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষ থাকলে তাঁদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, নদীর গতিপথ ও প্রাকৃতিক জলাধারগুলো পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার প্রস্তুতি জোরদার করা।শুধু প্রকৃতির নয়, মানুষেরও দায়নেপালের এই বিপর্যয় নিঃসন্দেহে একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কতটা হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে মানুষের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার ওপর।আগাম সতর্কতা থাকলে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা হলে, নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে এবং দুর্যোগ মোকাবিলার কার্যকর পরিকল্পনা থাকলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার সর্বোত্তম ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবকাঠামো পুনর্গঠন এখন জরুরি।তবে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা করে মানবজাতি টিকে থাকতে পারবে না। প্রকৃতির নিয়ম বুঝে, ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা করাই হতে পারে ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ। মৃত্যুঞ্জয় রায় কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

নেপালের হড়পা বান: প্রকৃতির রুদ্ররূপ নাকি মানুষেরও দায়?