যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে ট্রাম্পকে চাপে রাখতে চায় ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত ছয় মাসের সংঘাতের পর নিজেদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে বলে মনে করছে তেহরান। এ অবস্থায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে দেশটি। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাময়িক বিরতির পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। ইরান হরমুজ প্রণালি ও অঞ্চলটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নতুন বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি কিংবা পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে ইরানের তেমন আগ্রহ নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলাই তেহরানের অন্যতম লক্ষ্য। তবে ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত সংলাপের পথে না গিয়ে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করছে।
গোয়েন্দা পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার ফলে উল্টো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইরান আবারও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী জাহাজ এবং আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে।
সাইবার হামলাতেও তেহরানের নজর
সামরিক তৎপরতার পাশাপাশি সাইবার স্পেসকেও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১০০টি পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চালানো সাইবার হামলার পেছনে ইরানি হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতা ছিল। হামলায় পানীয় জল দূষিত না হলেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কিছু এলাকায় নাগরিকদের পানি ফুটিয়ে পান করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস খাতেও হামলার চেষ্টা চালাচ্ছে ইরানি হ্যাকাররা। যুদ্ধের শুরুর দিকে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমানে ইরানের সাইবার ইউনিটগুলো নতুন করে সংগঠিত হয়েছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করছেন।
মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে থেকেও মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি করে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর জনঅসন্তোষ বাড়ানোই এসব সাইবার তৎপরতার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণভাবে আরও ঐক্যবদ্ধ ইরান
মার্কিন কংগ্রেসের গোয়েন্দা কমিটির সদস্যদের মতে, ছয় মাসের সংঘাতে ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও দেশটির শাসনব্যবস্থা শুরু থেকেই এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিল। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ অনেকটা পাশ কাটিয়ে দেশটির নেতৃত্ব আগের তুলনায় আরও ঐক্যবদ্ধ।
এ ছাড়া ইরানের হাতে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত রয়েছে। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেটিকে দরকষাকষির শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তেহরান তা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে বলে গোয়েন্দা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করছে ইরান। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার তথ্য অনুযায়ী, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রিপাবলিকানবিরোধী প্রচারণামূলক বিভিন্ন নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা হয়েছে, যেগুলোর উৎস ইরান বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় ও দেশীয় সংবাদমাধ্যমেও যুদ্ধকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা দেশটির সরকারের মধ্যে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার হুমকি
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিও ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সম্প্রতি খার্গ দ্বীপের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের চারটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত বা রপ্তানি করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি এলাকায় আবারও বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। নাতানজ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। পাহাড়টির ভেতরে অত্যন্ত সুরক্ষিত ও ভূগর্ভস্থ টানেল রয়েছে বলে জানা যায়।
এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এত প্রাণহানির পরও সংঘাতের মাত্রাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি যুদ্ধটিকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।