একটি চিঠি, এক কিশোরের স্বপ্ন আর আত্মত্যাগ—শহীদ আনাসের গল্প আজও নাড়া দেয়
বাড়ি ছাড়ার আগে লিখে যাওয়া চিঠি হয়ে উঠেছে আত্মত্যাগের প্রতীক; সন্তানের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার আবেদন বাবা-মায়ের
ফিচার ডেস্ক:
ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে তরুণদের সাহস, স্বপ্ন আর আত্মত্যাগের গল্প লুকিয়ে থাকে। ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার কিশোর শাহারিয়ার খান আনাস। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে পরিবারের উদ্দেশে লেখা তার একটি চিঠি পরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। সেই চিঠি, তার শেষ দিনের স্মৃতি এবং একজন কিশোরের স্বপ্নভঙ্গের গল্প আজও আবেগ ছড়িয়ে দেয়।
সাধারণ এক কিশোরের স্বপ্ন
২০০৭ সালের ১৪ অক্টোবর জন্ম নেওয়া আনাস ছিলেন গেন্ডারিয়া আদর্শ একাডেমির বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা-মায়ের বড় সন্তান এবং দুই ছোট ভাইয়ের আদর্শ ছিলেন তিনি। শিক্ষক ও প্রতিবেশীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী হিসেবে। বড় হয়ে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার, আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ।
আন্দোলনের প্রতি গভীর টান
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় আনাস নিয়মিত সংবাদ দেখতেন, পত্রিকা পড়তেন এবং আহত-নিহতদের খবর তাকে গভীরভাবে নাড়া দিত। তিনি বাবার কাছে আন্দোলনে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে বাবা তাকে যেতে দেননি।
পরিবারের দাবি, সেই সময় নিজের অনুভূতি, প্রশ্ন ও ভাবনা তিনি খাতার পর খাতায় লিখে রাখতেন। শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছাড়ার আগে একটি চিঠিও লিখে যান, যেখানে পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং নিজের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরেন।
শেষ যাত্রা
পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, ৫ আগস্ট সকালে স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন আনাস। প্রথমে তাঁতীবাজার এলাকায় গিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগ দেন। সঙ্গে অতিরিক্ত কাপড়ও নিয়েছিলেন, কারণ তার ধারণা ছিল, আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে হয়তো বাসায় ফেরা সম্ভব হবে না।
পরে চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসকেরা তাকে আর বাঁচাতে পারেননি।
একটি ফোনকল, তারপর শোকের নীরবতা
দুপুরে আনাসের মায়ের ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। পরিবারের সদস্যদের দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে বাবা-মা দেখেন, তাদের সন্তানের নিথর দেহ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পড়ে আছে।
পরে তাকে জুরাইন কবরস্থানে তার দাদির কবরের পাশেই দাফন করা হয়।
বাবা-মায়ের আবেদন
আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি বলেন, আন্দোলনের সময় অন্য শহীদদের জন্য দোয়া করলেও নিজের সন্তানও সেই তালিকায় যুক্ত হবে, তা কখনো ভাবেননি।
অন্যদিকে বাবা শাহারিয়ার খান পলাশ বলেন, তাদের একটাই প্রত্যাশা—যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ যেন ভুলে না যায় দেশ। তিনি আরও বলেন, আনাসের লেখা চিঠি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে সংরক্ষণ এবং পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
একজন কিশোরের স্বপ্ন, পরিবারের প্রতি ভালোবাসা এবং তার রেখে যাওয়া একটি চিঠি—সব মিলিয়ে আনাসের গল্প আজও অনেকের কাছে স্মৃতি, বেদনা ও আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে আছে।