জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ‘বালুদস্যু’ নারীরা, ক্ষুধার কাছে হার মানছে কেপ ভার্দের সমুদ্র
অবৈধ বালু উত্তোলনে ধ্বংস হচ্ছে উপকূল, তবু দারিদ্র্যের তাড়নায় প্রতিদিন মৃত্যুকে সঙ্গী করছেন শত শত নারী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পর্যটকদের কাছে নীল সমুদ্র আর মনোরম সৈকতের দেশ হিসেবে পরিচিত পশ্চিম আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। তবে দেশটির সান্তিয়াগো দ্বীপের চার্কো সৈকতের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সেখানে নেই পর্যটকদের ভিড়, নেই অবকাশযাপনের আনন্দ। বরং প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল আটলান্টিকের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে সমুদ্রের তলদেশ থেকে বালু তুলছেন একদল নারী। স্থানীয়দের কাছে তারা পরিচিত ‘বালুদস্যু’ (স্যান্ড থিভস) নামে।
ভাটার সময় ভানিয়া তাভারেস, মারিয়া এলেনর মন্তেইরোসহ অনেক নারী পাথুরে উপকূলে নেমে পড়েন। প্রায় ১০ কেজির বেশি ওজনের কালো বালুভর্তি বালতি মাথায় নিয়ে পিচ্ছিল পাথর আর উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে তীরে ফিরতে হয় তাদের। সামান্য ভুলেই ঘটতে পারে প্রাণহানি।
গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই কঠিন পরিশ্রম করেই পরিবার চালাচ্ছেন তারা। কয়েক সপ্তাহ ধরে সংগ্রহ করা বালু এক ট্রাক্টরভর্তি বিক্রি করে তারা পান মাত্র ১৪০ ডলার। বৈধভাবে উত্তোলিত বালুর তুলনায় কম দামে বিক্রি হওয়ায় অসাধু ঠিকাদারদের কাছে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
দারিদ্র্যই তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় ঠেলে দিয়েছে। ভানিয়া মাত্র ১৩ বছর বয়সে অভাবের কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। গত ১৬ বছর ধরে বালু তুলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তিনি। রান্নার গ্যাস কেনার সামর্থ্য না থাকায় এখনো কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করতে হয়। অন্যদিকে মারিয়া বলেন, বছরের পর বছর ভারী বালুর বোঝা বহন করতে গিয়ে তার পায়ে ক্ষত আর পিঠে স্থায়ী ব্যথা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। একসময় বালুময় চার্কো সৈকত এখন পরিণত হয়েছে পাথর ও বড় বড় গর্তে। উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ভেঙে পড়ায় লবণাক্ত পানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি। এরই মধ্যে শতাধিক কৃষক জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
কেপ ভার্দেতে ১৯৯৭ সাল থেকে সমুদ্রসৈকত থেকে বালু উত্তোলন আইনত নিষিদ্ধ। এ অপরাধে জেল-জরিমানার বিধান থাকলেও বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে নমনীয় অবস্থান নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পরিবেশবাদী সংগঠন লানতুনার সহায়তায় কিছু নারী শূকর ও ভেড়া পালনের মতো বিকল্প পেশায় যুক্ত হলেও অধিকাংশের জন্য এখনো বালু তোলাই জীবিকার একমাত্র পথ।
মারিয়া এলেনর মন্তেইরো বলেন, একসময় তারা বিশ্বাসই করেননি যে বালু তুলতে তুলতে সৈকত ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন বাস্তবতা চোখে দেখে তার গভীর অনুশোচনা। তিনি বলেন, “যদি অন্য কোনো কাজের সুযোগ পাই, তাহলে আর কখনো এই সৈকতে বালু তুলতে আসব না।”
কেপ ভার্দের এই নারীদের গল্প শুধু দারিদ্র্যের নয়; এটি জীবিকার তাগিদে পরিবেশ ধ্বংসের কঠিন বাস্তবতা এবং বেঁচে থাকার জন্য মানুষের মরিয়া সংগ্রামের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।