প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নারী কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে ধর্মঘট, একদিন বন্ধ আইফেল টাওয়ার
||
নারী কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে ধর্মঘট, একদিন বন্ধ আইফেল টাওয়ারফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বিশ্বখ্যাত আইফেল টাওয়ারে নারী কর্মীদের লিঙ্গের কারণে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে কর্মীদের ধর্মঘট হয়েছে। এর জেরে সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) একদিন দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ছিল পর্যটনকেন্দ্রটি। মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) আবার তা খুলে দেওয়া হয়।অভিযোগের সূত্রপাত গত শনিবার। সেদিন একটি হিন্দু ধর্মীয় প্রতিনিধিদলের ব্যক্তিগত সফরের সময় নারী কর্মীদের ওই দলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আইফেল টাওয়ারের কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।কর্মীদের অভিযোগ, প্রায় ১০০ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি আইফেল টাওয়ারে গেলে কয়েকজন নারী কর্মীকে তাঁদের কর্মস্থল থেকে সরে যেতে বলা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের জায়গায় পুরুষ কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিনিধিদলটি টাওয়ারের নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থানকালে নারী কর্মীদের কয়েকটি এলাকা দিয়ে চলাচল না করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।ফরাসি শ্রমিক সংগঠন সিজিটি এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, নারী কর্মীদের তাঁদের লিঙ্গের কারণে সরিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের পরিবর্তে পুরুষ কর্মী নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সিজিটির মতে, এ ধরনের আচরণ কর্মক্ষেত্রে সমতা ও কর্মীদের মর্যাদার নীতির পরিপন্থী।আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সোসিয়েতে দেকসপোয়াতাসিওঁ দ্য লা তুর এফেল জানিয়েছে, প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে নারী কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখার অনুরোধ এসেছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটির স্বীকারোক্তি, এ ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া উচিত হয়নি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নারী-পুরুষের সমতা এবং স্থাপনাটি পরিচালনার নিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঘটনাটি তদন্ত করে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল আন্তর্জাতিক হিন্দু ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন বিএপিএসের একটি প্রতিনিধিদল। ফ্রান্সে সংগঠনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে সফরটি অনুষ্ঠিত হয়। প্যারিসের উপকণ্ঠে ব্যুসি-সাঁ-জর্জ এলাকায় সংগঠনটির একটি বড় হিন্দু মন্দির উদ্বোধন উপলক্ষে ওই সময় বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিও চলছিল।তবে নারী কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বিএপিএস ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিনিধিদলের সদস্যসংখ্যা বেশি হওয়ায় অন্য দর্শনার্থী ও কর্মীদের অসুবিধা কমাতে আইফেল টাওয়ার খোলার সময়ের শুরুতেই সফরটি আয়োজন করা হয়েছিল। কাউকে আইফেল টাওয়ারে প্রবেশে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল না বলেও দাবি করেছে তারা। তবে এ ঘটনায় কারও কষ্ট বা অসুবিধা হয়ে থাকলে দুঃখ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।ঘটনাটি ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ার বিষয়টিকে গুরুতর উল্লেখ করে দ্রুত তদন্তের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নারী ও পুরুষের সমতার নীতি প্যারিসের কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রবেশদ্বারে এসে থেমে যেতে পারে না। কী ঘটেছিল এবং এ ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য কারা দায়ী, তা দ্রুত স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট ইয়ায়েল ব্রাউন-পিভে বলেন, অন্য সংস্কৃতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে স্বাগত জানানোর অর্থ ফ্রান্সের নিজস্ব মূল্যবোধ ত্যাগ করা নয়। তাঁর মতে, ফ্রান্সে নারীরা জনজীবনের পূর্ণাঙ্গ অংশ এবং তাঁদের আড়ালে রাখার কোনো সুযোগ নেই।এদিকে সোমবার কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে আইফেল টাওয়ারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে ‘কার্যক্রমগত কারণে’ দর্শনার্থীদের প্রবেশে বিলম্বের কথা জানানো হলেও পরে কর্মীদের প্রতিবাদের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। দিনভর কর্তৃপক্ষ ও কর্মী প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা চলে।আলোচনার পর পরিস্থিতির উন্নতি হলে মঙ্গলবার আইফেল টাওয়ার আবার দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। তবে নারী কর্মীদের কেন সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কার নির্দেশে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং পরিচালনা কর্তৃপক্ষ কেন ওই অনুরোধ মেনে নিয়েছিল—এসব বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনাটি ফ্রান্সে নারী-পুরুষের সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আহসান উল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আর টি এন নিউজ ২৪