প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
রামপালে নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষ, শিশুর প্ল্যাকার্ডে আকুতি—‘খোদার কাছে বিচার দিলাম’
||
‘খোদার কাছে বিচার দিলাম’—নদীভাঙনে নিঃস্ব নাবিদের প্ল্যাকার্ডে গ্রামের আর্তনাদহাতে প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা—‘খোদার কাছে বিচার দিলাম’। বয়স আট-দশ বছরের বেশি হবে না। বাবা-মায়ের সঙ্গে নদীভাঙন থেকে গ্রাম রক্ষার দাবিতে মানববন্ধনে এসেছিল শিশু নাবিদ হাসান। নদীভাঙনে বারবার ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবারের এই শিশুর হাতে থাকা প্ল্যাকার্ড যেন তুলে ধরেছে পুরো এলাকার মানুষের অসহায়ত্ব।আজ রোববার দুপুরে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের রোমজাইপুরে মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের ভাঙনকবলিত এলাকায় এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধরাও অংশ নেন।নাবিদের মা সাজেদা বেগম বলেন, ‘প্রতিবছর নদীভাঙনে আমরা নিঃস্ব হচ্ছি। এখন মাথা গোঁজার ঠাঁইও নেই। অল্প একটু জায়গায় বাঁশ ও গোলপাতা দিয়ে কোনো রকমে মাচা করে থাকি। কতবার একটি বাঁধের দাবি জানিয়েছি। সরকার যায়, সরকার আসে—আমরা শুধু আশ্বাসই পাই, সমাধান হয় না।’স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রোমজাইপুর গ্রামের তিন পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আন্তর্জাতিক নৌপথ মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল। কয়েক বছর ধরে অব্যাহত ভাঙনে এরই মধ্যে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় ফসলি জমি, সড়ক ও মৎস্যঘেরও ঝুঁকিতে পড়েছে।ভাঙনের কারণে পেড়িখালী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রোমজাইপুর পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ ধসে গেছে। জোয়ারের সময় গ্রামের মানুষের একমাত্র সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ভাঙনে বৈদ্যুতিক খুঁটিও নদীতে পড়ে গেছে। অনেক পরিবার বসতভিটা ও জমি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে।শুধু রোমজাইপুর নয়, রামপাল উপজেলার সিঙ্গাইরবুনিয়া, ওড়াবুনিয়াসহ কয়েকটি গ্রামও নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।মানববন্ধনে এলাকাবাসী ‘টেকসই বাঁধ চাই’, ‘আওয়াজ তোলো, বাঁধ গড়ো’, ‘এক দফা এক দাবি—ভাঙন রোধে বাঁধ চাই’ ও ‘ইউ ওয়ান্ট জাস্টিস’ লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের কারণে রোমজাইপুর ও আশপাশের এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। বহু ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হলে পুরো গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর তীব্র স্রোত ও জাহাজ চলাচলের ঢেউয়ে ভাঙন বাড়ছে। পাশাপাশি নদী খননের নামে অপরিকল্পিত কাজের কারণেও পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। ভাঙা সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটছে বলে জানান তাঁরা।পেড়িখালী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বয়জিৎ শেখ বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে এলাকাটি নদীভাঙনের কবলে। বহু পরিবার বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়েছে। দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা না হলে পুরো গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’মহিলা ইউপি সদস্য রিনা বেগম হিনা বলেন, প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এলাকাবাসী। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে রোমজাইপুরের অস্তিত্ব মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে।স্থানীয় উদ্যোক্তা ফিরোজ মাঝি বলেন, নদীভাঙনে মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।স্থানীয় বাসিন্দা তুহিন মোল্লা বলেন, শুধু বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলেই হবে না। নদীভাঙনে যারা ঘরবাড়ি, জমি ও সম্পদ হারিয়েছেন, তাঁদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।তিনি বলেন, গ্রামের বিপরীত পাশে জেগে ওঠা চরও ভাঙনের অন্যতম কারণ। ওই চরের বড় একটি অংশ ড্রেজিং করা হলে গ্রামের দিকে স্রোতের তীব্রতা কমবে এবং ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রোমজাইপুরের ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীও এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। সেটি অনুমোদন হলে কাজ শুরু করা যাবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আহসান উল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আর টি এন নিউজ ২৪