প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
মোবাইল স্ক্রিনের বদলে বই, বেরোবিতে ‘পঠিত’-এর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
মোবাইল স্ক্রিনের বদলে বই, বেরোবিতে ‘পঠিত’-এর ব্যতিক্রমী উদ্যোগবেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদকহাতে বই, এক ঘণ্টার জন্য থেমে যায় মোবাইলের স্ক্রলিং, নেই কোনো নোটিফিকেশনের ব্যস্ততা। শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যস্ততা থেকে বিরতি দিয়ে বইয়ের পাতায় মনোযোগী করতেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ঘণ্টাব্যাপী ‘সাইলেন্স রিডিং আওয়ার’ আয়োজন করেছে তরুণদের সামাজিক উদ্যোগ ‘পঠিত’।প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে মোবাইল ফোন যেন তরুণদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পড়াশোনা, বিনোদন কিংবা অবসর—সবকিছুতেই বাড়ছে স্ক্রিনের উপস্থিতি। সেই অভ্যাস থেকে অন্তত এক ঘণ্টার বিরতি নিয়ে বইয়ের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করতেই ‘পঠিত’-এর এই উদ্যোগ।‘সাইলেন্স রিডিং আওয়ার’-এ অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা এক ঘণ্টার জন্য নিজেদের মোবাইল ফোন জমা রাখেন। এরপর নীরব পরিবেশে যে যার পছন্দের বই নিয়ে বসেন। উদ্দেশ্য, কিছু সময়ের জন্য স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা এবং বইয়ের পাতায় মন দেওয়া।আয়োজকদের বিশ্বাস, এক দিনের এমন আয়োজনের চেয়ে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট সময় মোবাইল থেকে দূরে থেকে বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে তরুণদের দৈনন্দিন জীবনেও বইমুখী হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে কমতে পারে মোবাইল ফোনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।১০ টাকায় বই পড়ার সুযোগশুধু ‘সাইলেন্স রিডিং আওয়ার’ নয়, সহজ শর্তে তরুণদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়াও ‘পঠিত’-এর অন্যতম লক্ষ্য। মাত্র ১০ টাকা সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে পাঠকদের বই পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বই পড়া শেষে পাঠকেরা বইটি ফেরত দেন।বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে যাওয়া, মলাট নষ্ট হওয়া এবং আনুষঙ্গিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের ব্যয় মেটাতেই মূলত এই নামমাত্র সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। অর্থাৎ বই কেনার সামর্থ্য বা সুযোগ না থাকলেও স্বল্প খরচে বই পড়ার একটি পথ তৈরি করছে উদ্যোগটি।পঠিত টিমের সদস্য দীপ্ত তালুকদার বলেন, “মোবাইল ফোন আমাদের জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের বই পড়া ও অর্থবহ অবসর কাটানোর অভ্যাসকে অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছে। ‘সাইলেন্স রিডিং আওয়ার’-এর মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের অন্তত এক ঘণ্টার জন্য মোবাইল থেকে দূরে রেখে বইয়ের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করতে চাই। আমাদের প্রত্যাশা, এই এক ঘণ্টাই একসময় নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস তৈরির শুরু হবে।”বইয়ের সঙ্গে তরুণদের সম্পর্ক তৈরি করার পাশাপাশি তাঁদের মানসিক সুস্থতা ও ইতিবাচক বিকাশে ভূমিকা রাখাও ‘পঠিত’-এর অন্যতম লক্ষ্য। ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে বই পড়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ও পরিবেশ তৈরি করা তরুণদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়ক হবে বলে মনে করেন উদ্যোগটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।পঠিত টিমের আরেক সদস্য সুবর্ণা শিকদার বলেন, “আমরা চাই বই পড়া শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি বা একাডেমিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তরুণদের দৈনন্দিন জীবনের আনন্দের অংশ হয়ে উঠুক। ‘সাইলেন্স রিডিং আওয়ার’-এ নীরব পরিবেশে বই পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের জন্য কিছুটা সময় বের করে নিতে পারছেন। এমন ছোট ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।”হারাগাছ থেকে বেরোবি‘পঠিত’ এর গল্প অবশ্য নতুন নয়। ২০২০ সালে রংপুরের হারাগাছে উদ্যোগটির যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০২৪ সালে নতুন উদ্দীপনায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এর কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হয়।বর্তমানে বেরোবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাতজন শিক্ষার্থী উদ্যোগটির কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। তাঁরা হলেন, আব্দুল্লাহ আল হাসান দীপ্ত, মনিরুল ইসলাম, ইবতেশাম রহমান সাইনাভ, পারভেজ হাসান, সুবর্ণা শিকদার, সাদিয়া আক্তার সূচী ও সানিয়া খন্দকার।পঠিত টিমের সদস্য পারভেজ হাসান বলেন, “‘পঠিত’ এর মূল লক্ষ্য শুধু বই দেওয়া নয়; বরং তরুণদের বইয়ের সঙ্গে একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করা। মাত্র ১০ টাকা সার্ভিস চার্জে বই পড়ার সুযোগ এবং ‘সাইলেন্স রিডিং আওয়ার’-এর মতো আয়োজনের মাধ্যমে আমরা বইকে শিক্ষার্থীদের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে চাই। ভবিষ্যতে আরও বেশি শিক্ষার্থীকে এই পাঠচর্চার সঙ্গে যুক্ত করাই আমাদের লক্ষ্য।”বইয়ের পাতায় ফিরছে ক্যাম্পাসসময়ের সঙ্গে বেরোবি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ‘পঠিত’ সাড়া ফেলেছে। নিয়মিত বই নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ‘সাইলেন্স রিডিং আওয়ার’ এর মতো পাঠ কার্যক্রমেও আগ্রহের সঙ্গে অংশ নিচ্ছেন।এক ঘণ্টা হয়তো খুব বেশি সময় নয়। কিন্তু সেই এক ঘণ্টায় যদি মোবাইলের স্ক্রিনের বদলে কেউ বইয়ের পাতায় চোখ রাখেন, সেটিই হয়তো তৈরি করতে পারে বড় কোনো অভ্যাসের শুরু। ‘পঠিত’-এর উদ্যোগের লক্ষ্যও যেন সেখানেই তরুণদের জীবন থেকে প্রযুক্তিকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রযুক্তির পাশাপাশি বইয়ের জন্যও একটি নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করা।আয়োজকদের আশা, মোবাইল ফোন থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে বই পড়ার এই ছোট অভ্যাস একসময় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠবে। আর সেই পথ ধরে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের মাঝেও তরুণদের জন্য তৈরি হবে বই, চিন্তা ও সুস্থ অবসরের নিজস্ব এক জগৎ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আহসান উল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আর টি এন নিউজ ২৪