প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬
বর্জ্য না পুড়িয়েই বিদ্যুৎসহ বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের মেগা পরিকল্পনা
||
বর্জ্যের ভাগাড় থেকে বিদ্যুৎ ও সম্পদ: ঢাকায় আসছে ৪ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার প্রকল্পঢাকা প্রতিনিধি: সকালে পরিচ্ছন্ন, সন্ধ্যা নামলেই যেন বর্জ্যের ভাগাড়—রাজধানী ঢাকার এমন চিত্র এখন অনেকটাই পরিচিত। একদিকে সুউচ্চ ভবন, মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ের আধুনিকতা; অন্যদিকে সড়ক, ফুটপাত ও বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক, পচা আবর্জনা আর দুর্গন্ধ। প্রায় দুই কোটি মানুষের এই মহানগরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট দিন দিন বড় হচ্ছে।দুই সিটি করপোরেশন নিয়মিত সড়ক পরিষ্কার করলেও দিনের বেলা বিভিন্ন স্থান ফের ময়লা-আবর্জনায় ভরে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বর্জ্যকে বোঝা না বানিয়ে তা থেকে বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে দুটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটির প্রকল্পে বর্জ্য না পুড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ, মিথেন গ্যাস, জৈব সার, পশুখাদ্য, পাইরোলাইসিস তেল, এসআরএফ ও ইকো-ব্রিকসসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।জানা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে রাজধানীতে দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে শতাধিক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করা হয়েছে। এতে সড়কের পাশের উন্মুক্ত ডাস্টবিন ও বড় কনটেইনারের ব্যবহার কমলেও অনেক এসটিএস এখন অপরিকল্পিত অবস্থান, জায়গার সংকট ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে আশপাশের মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকে বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে সড়ক ও ফুটপাতে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। গত ১২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রকল্প দুটির অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পগুলো চালু হলে দীর্ঘমেয়াদে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।তবে দুই সিটি করপোরেশনের প্রকল্পের পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। অন্যদিকে ডিএসসিসি বর্জ্য না পুড়িয়ে তা থেকে বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে।বিশেষজ্ঞদের একাংশ বর্জ্য পোড়ানোর প্রকল্প নিয়ে পরিবেশগত ঝুঁকির কথা বলছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের বর্জ্যের বড় অংশই ভেজা ও পচনশীল জৈব বর্জ্য। এসব বর্জ্যের তাপ উৎপাদন ক্ষমতা কম হওয়ায় পোড়াতে অতিরিক্ত জ্বালানির প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও রাসায়নিকযুক্ত বর্জ্য পোড়ানোর ক্ষেত্রে ডাইঅক্সিন ও ফিউরানের মতো ক্ষতিকর পদার্থ নির্গমনের ঝুঁকি রয়েছে।অন্যদিকে ডিএসসিসির প্রকল্পে প্রতিদিনের প্রায় ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্জ্য থেকে বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এ গ্যাস ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৮১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিদিন প্রায় ৪১০ টন জৈব সার, ২০ টন বিএসএফ প্রোটিন, ১১ দশমিক ৫২ টন বিএসএফ তেল, ৪৭ হাজার ৭৭৫ লিটার পাইরোলাইসিস তেল, ৭ দশমিক ৩৫ টন পাইরোলাইসিস ব্ল্যাক কার্বন, ২৫৫ টন সলিড রিকভারড ফুয়েল (এসআরএফ) এবং ১২৮ টন ইকো-ব্রিকস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হতে পারে। উৎপাদন শুরুর সম্ভাব্য সময় আগামী জানুয়ারি। প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ১৫ বছর।চুক্তি অনুযায়ী, জমি সরবরাহ ছাড়া প্রকল্পে ডিএসসিসির বড় ধরনের সরাসরি আর্থিক বিনিয়োগ থাকছে না। বিদেশি উৎস থেকে প্রকল্পের বিনিয়োগ আসবে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রির লভ্যাংশের ২০ শতাংশ ডিএসসিসি পাবে। পাশাপাশি জায়গা ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে আরও ৫০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে।স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। প্রকল্পের জন্য মোট ৪৫ একর জায়গা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ১০ একর জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে এমওইউ হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও প্রকল্পটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে বৈঠক হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আহসান উল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আর টি এন নিউজ ২৪