প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: তিন দিনে ১৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রক্তক্ষয়, আহত ২০০+
||
ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: তিন দিনে ১৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রক্তক্ষয়, আহত ২০০+জুলাই অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় সংঘাত, হাসপাতালেও হামলার অভিযোগদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবারও অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ, কর্মসূচিতে বাধা ও বহিরাগত প্রবেশের অভিযোগ ঘিরে গত তিন দিনে তিন বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। উভয় পক্ষের দাবি অনুযায়ী, এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত দুই শতাধিক ব্যক্তি — শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও জকসু নেতাসহ দুই সংগঠনের কর্মীরা।কী ঘটেছেলাঠিসোঁটা, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া, ভাঙচুর, এমনকি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এটাই দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ। পরিস্থিতি সামলাতে একাধিক ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত সংঘর্ষ হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (রংপুর), বরিশাল বিএম কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ ও নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে।জবিতে সূত্রপাতজুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে মঙ্গলবার আয়োজিত আলোচনাসভা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘিরে জকসু, ছাত্রশক্তি, ছাত্রদল ও প্রশাসনের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন নিয়ে বিরোধ সংঘর্ষে রূপ নেয়, আহত হন জকসুর ভিপি-জিএস-এজিএসসহ অন্তত ৭০ জন। পরে মেডিক্যাল সেন্টার ও পার্শ্ববর্তী ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের ওপর দফায় দফায় হামলার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।ঢাকা কলেজ, আলিয়া মাদ্রাসা, গ্রাফিক আর্টসএকই দিন ঢাকা কলেজে শিবিরের আলোচনাসভার প্রস্তুতিকালে সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ২৭ জন। সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় হল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে অধ্যক্ষসহ আহত হন অন্তত ৩০ জন; পরে ছাত্রদল হলের কক্ষ ভাঙচুর করে শিক্ষার্থীদের বের করে ফটকে তালা লাগিয়ে দেয়। গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটে রাতে শিবিরের ১০-১৫ শিক্ষার্থীকে মারধর করে হল থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।রংপুরে বেরোবিসোমবার রাতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শনীর ছবি নিয়ে বিরোধ থেকে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে আহত হন অন্তত পাঁচ জন। পরদিন উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করে এবং প্রধান ফটকে "শিবিরমুক্ত ক্যাম্পাস" লেখা হয়। প্রশাসন তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। তবে গতকাল জুলাই অভ্যুত্থান দিবসে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে — উপাচার্যসহ ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীরা একই মঞ্চে আনন্দ শোভাযাত্রা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।বরিশাল ও নারায়ণগঞ্জবরিশাল বিএম কলেজে শিবির কর্মীদের মারধর করে ক্যাম্পাস ও দুটি ছাত্রাবাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে; আহত হন ১০-১২ জন। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যালিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ২৫ জন, যার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবির সভাপতি গুরুতর আহত হন। নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজে বুধবার দুপুরে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ১৫-২০ জন আহত হন।প্রেক্ষাপট২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ক্যাম্পাসগুলো ছিল নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দখলে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বেশির ভাগ পদে জয়ী হয় শিবির-সমর্থিত প্যানেল। ছাত্রদলের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলে শিবির পরিচয় গোপন রেখে সংগঠন গুছিয়েছে, আর তাদের থাকতে হয়েছে ক্যাম্পাসের বাইরে। এর মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হল সংসদ নেতার কক্ষ থেকে দুই অতিথিকে আটক ঘিরে সমকামিতার অভিযোগ ওঠে, যা নিয়েও সংঘর্ষ বাধে।গকসুর এজিএস সামিউল হাসান শোভনের একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যেখানে তিনি সহিংস প্রতিক্রিয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে সমালোচনা উঠেছে।পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়নগত কয়েক মাসের সংঘর্ষের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, কমিটি গঠন, আধিপত্য বিস্তার, হল নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব প্রধান কারণ। দলীয় প্রভাবমুক্ত শিক্ষাঙ্গন ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের যে দাবি জুলাই আন্দোলনের অন্যতম চেতনা ছিল, তা এখনো অধরা রয়ে গেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা অস্ত্রধারীদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আহসান উল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আর টি এন নিউজ ২৪