প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬
বাম্পার ফলনের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার, ৭০ একর জমিতে শিষহীন ধান
||
চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার নায়েরগাঁও উত্তর ইউনিয়নের চার গ্রামের অর্ধশত কৃষক হাইব্রিড ধানের আবাদ করে চরম বিপাকে পড়েছেন। বাম্পার ফলনের আশায় বিএনআর নামের একটি হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করলেও প্রায় ৭০ একর জমির অধিকাংশ খেতে শিষ আসেনি। কোথাও শিষ এলেও সেগুলোর বেশির ভাগই চিটা। এতে কৃষকদের কয়েক মাসের শ্রম এবং লাখ লাখ টাকার বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো হলো গোবিন্দপুর, নন্দীখোলা, কাচিয়ারা ও বকচর। কৃষকেরা স্থানীয় এক ডিলারের কাছ থেকে প্রতি কেজি বীজ সাড়ে ৫০০ টাকা দরে কিনে বীজতলা তৈরি করেন। পরে নিয়ম মেনে জমিতে চারা রোপণ, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগসহ প্রয়োজনীয় সব পরিচর্যাও করেন।কৃষকদের দাবি, বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাঁদের প্রতি একরে ১০০ মণ পর্যন্ত ফলনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই আশ্বাসে কেউ ঋণ নিয়েছেন, কেউ সঞ্চয়ের টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু চার মাস পর মাঠে গিয়ে তাঁরা দেখছেন, অধিকাংশ ধানগাছে শিষই আসেনি।নন্দীখোলা গ্রামের কৃষক আয়েশা বেগম আড়াই একর জমিতে এই ধান আবাদ করেছিলেন। নিজের জমির পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “কোম্পানির লোকজন কইছিল, একরে ১০০ মণ ধান হইব। সেই কথা বিশ্বাস কইরা আড়াই একর জমিতে চাষ করছি। যা যা লাগে সব দিছি। চার মাস পার হইয়া গেছে, কিন্তু ধান নাই। এখন আমি কী নিয়া বাঁচমু?”একই অভিযোগ করেন কৃষক মাসুদ আলম, গোলাম মোস্তফা, জামাল হাজি, মিজানুর রহমান ও আবুল কালামসহ অন্যরা। তাঁদের ভাষ্য, প্রতি একর জমিতে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। কিন্তু ফলনের কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে অনেকেরই উৎপাদন ব্যয় তো উঠবেই না, উল্টো ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।সরেজমিনে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ জমিতে ধানগাছ দাঁড়িয়ে থাকলেও অধিকাংশ গাছে শিষ নেই। কোথাও শিষ থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই ফাঁপা। অনেক কৃষক খড় কাটার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, খড় কাটার খরচও বিক্রি করে ওঠানো সম্ভব হবে না।গোবিন্দপুর গ্রামের এক কৃষক বলেন, “ধান তো পাই নাই, এখন খড় কাটলেও লোকসান। কাটার মজুরি দেওয়ার সামর্থ্যও নাই।”কৃষকদের অভিযোগ, বীজ বিক্রির সময় উচ্চ ফলনের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন ফলন বিপর্যয়ের পর তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষিনির্ভর অনেক পরিবারের সারা বছরের জীবিকায় এ ক্ষতির প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তাঁরা।এ বিষয়ে বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান বলেন, “আমরা ক্ষতিগ্রস্ত জমিগুলো পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানি অবগত আছে। কেন এমন হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কৃষকদের সহযোগিতার বিষয়টি কোম্পানি বিবেচনা করবে।”মতলব দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চৈতন্য পাল বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। কৃষকদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। সমস্যার কারণ নির্ণয়ে নমুনা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে, তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”
ফলনহীন মাঠের দিকে তাকিয়ে হতাশ কৃষকেরা দ্রুত তদন্ত, ক্ষতির কারণ নির্ণয় এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ ক্ষতি সামাল দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আহসান উল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আর টি এন নিউজ ২৪