প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬
ভয় কাটিয়ে নিজেদের গড়ছেন রংপুরের মেয়েরা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ভয় কাটিয়ে নিজেদের গড়ছেন রংপুরের মেয়েরারংপুর প্রতিনিধিবাড়ির বাইরে একা পথ চলা, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামলানো কিংবা নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবলে অনেক মেয়ের মনেই জেগে ওঠে একটা অদৃশ্য ভয়। সেই ভয়কে জয় করতে এগিয়ে আসছেন রংপুরের কিছু তরুণী। হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন কারাতে—শুধু শরীরচর্চার জন্য নয়, আত্মবিশ্বাস আর আত্মরক্ষার শক্তি অর্জনের জন্য।২০২৪ সালের শেষ দিকে যাত্রা শুরু করে রংপুর জেলা কারাতে একাডেমি। এরই মধ্যে সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ৭২ জন মেয়ে। এর পেছনে আছে অনেক পরিবারের বদলে যাওয়া ভাবনা, অনেক মেয়ের সাহস করে এগিয়ে আসার গল্প।শ্যামলী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী জেনিয়া আক্তার মোনালিসার (১৯) বয়স যখন অনেক কম, তখন থেকেই ইচ্ছে ছিল কারাতে শিখবেন। কিন্তু পারিবারিক দ্বিধা আর সম্মতির অভাবে স্বপ্নটা দীর্ঘদিন ঘরেই আটকে ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই বাধা পেরিয়ে এখন তিনি এই একাডেমিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।মোনালিসা বলেন, "প্রথম দিন প্রশিক্ষণে এসে অনেক ভালো লেগেছিল। ছোট থেকেই ইচ্ছে ছিল কারাতে শিখব। মেয়েদের আত্মবিশ্বাস আর আত্মরক্ষার জন্য এটা অনেক জরুরি বলে মনে করি।"তবে শুরুটা সহজ ছিল না। পরিবার প্রথমে মেনে নেয়নি। মোনালিসা জানান, "আম্মু বলেছিল, তুই মেয়ে মানুষ হয়ে কারাতে শিখে কী করবি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছেন, এটি মেয়েদের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়।"প্রশিক্ষণ শুরুর পর থেকেই নিজের মধ্যে পরিবর্তন টের পাচ্ছেন তিনি। বলেন, "নিজের মধ্যে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। রাস্তাঘাটে হয়রানি বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে এখানে শেখা কৌশলগুলো কাজে লাগবে।"'আমি পাশে না থাকলেও যেন নিজেকে সামলাতে পারে'শুধু মোনালিসা নন, একাডেমিতে আসছেন আরও অনেক তরুণী। তাদের অভিভাবকদের ভাবনাতেও এসেছে পরিবর্তন। তাসমি আহমেদ তানহার (১১) মা সাইফুন নাহার বলেন, "মেয়েদের একা চলাফেরা করতে হয়। সব সময় তো আমরা পাশে থাকতে পারব না। তাই সে যেন যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নিতে পারে, সেটাই চাই।"তিনি আরও বলেন, "আত্মরক্ষার জন্য মেয়েদের এমন প্রশিক্ষণ নেওয়া জরুরি। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে।"আগে যে পরিবারগুলো মেয়েদের মার্শাল আর্ট শেখার বিষয়ে সংকোচ বোধ করত, তারাও এখন এগিয়ে আসছেন।কয়েক মাসেই বদলে যাচ্ছে চেহারারংপুর জেলা কারাতে একাডেমির প্রশিক্ষক মোঃ সামিউল আলিম সাগর (২৬) জানান, নতুনরা শুরুতে কারাতে সম্পর্কে তেমন কিছু জানত না। কিন্তু কয়েক মাসের প্রশিক্ষণেই তাদের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসছে।তিনি বলেন, "বর্তমান সময়ে ছোট শিশু থেকে শুরু করে অনেক নারী হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আত্মরক্ষার কৌশল জানা থাকলে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারবে।"রংপুরে মেয়েদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে বলেও জানান তিনি। বলেন, "এখন গ্রামের মেয়েরাও সচেতন হচ্ছে। আগ্রহ নিয়ে প্রশিক্ষণে আসছে।"'আগের চেয়ে অনেক আত্মবিশ্বাসী'বয়স মাত্র ১১ বছর, তবু তাসমি আহমেদ তানহা বুঝে গেছেন কারাতে কেন দরকার। একই একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে এসে কাছ থেকে দেখছেন সহপ্রশিক্ষণার্থী মোনালিসার বদলে যাওয়া। তিনি বলেন, "জেনিয়া আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে। তার মধ্যে অনেক আত্মবিশ্বাস এসেছে।"পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, "এখানকার পরিবেশ অনেক ভালো। মেয়েদের নিজেদের রক্ষা করার জন্য এ ধরনের প্রশিক্ষণ সত্যিই দরকার।"কারাতে শুধু একটি খেলা বা ব্যায়াম নয়—রংপুরের এই মেয়েদের কাছে এটি এখন ভয় জয়ের একটি পথ। নিজেকে চেনার, নিজের ওপর ভরসা রাখার একটি উপায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আহসান উল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আর টি এন নিউজ ২৪