নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা: এক সপ্তাহ পরও ভূগর্ভস্থ টানেলে ‘জীবিত’ শ্রমিকদের আশায় উদ্ধারকারীরা
হিমালয়ের কোলঘেঁষা উপত্যকায় আকস্মিক বন্যার পর পেরিয়ে গেছে এক সপ্তাহ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা, স্বজন হারিয়ে শোকের মাতম চলছে। জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা দিন দিন ক্ষীণ হলেও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ভূগর্ভস্থ টানেলে আটকে থাকা শ্রমিকদের নিয়ে এখনো আশা ছাড়ছেন না স্বজন ও উদ্ধারকারীরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল ও চীনের তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা এক হাজার ১০০ ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত সাড়ে চার হাজার মানুষ।
ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও নেপালের জাতীয় জরুরি পরিচালনা কেন্দ্রের (এনইওসি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফণীন্দ্র পাউডেল আশা ছাড়ছেন না। তিনি বলেন, জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে। তারপরও উদ্ধারকারীরা প্রার্থনা করছেন এবং আশা ছাড়ছেন না।
ভূগর্ভস্থ টানেলে চলছে মূল উদ্ধার অভিযান
বর্তমানে উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে উঠেছে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ টানেল। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আমশু কিরণ শাহি জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওয়ার হাউসগুলোতে সাধারণত সুরক্ষিত কক্ষ থাকে। সেখানে কয়েক দিন টিকে থাকার মতো খাবার ও পানি মজুত থাকার কথা।
এ কারণে অন্তত চারটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকরা এখনো বেঁচে থাকতে পারেন বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে পাইপের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকরা যাতে তুলনামূলক শুষ্ক ও নিরাপদ স্থানে শ্বাস নিতে পারেন, সে জন্য এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জটিল এই উদ্ধার অভিযানে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে।
তিব্বতে উদ্ধার অভিযান জোরদার
সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অংশে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
চীন নেপালের সঙ্গে যোগাযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ গিরোং সীমান্ত সড়কটি পুরোপুরি চালুর ব্যবস্থা করেছে। এর ফলে ভারী এক্সকাভেটর, ডিজিটাল লাইফ-ডিটেক্টর ও প্রশিক্ষিত কুকুরের দল দুর্গত এলাকায় পৌঁছাতে পারছে।
ধ্বংসস্তূপে শেষ সম্বল খুঁজছেন বেঁচে যাওয়া মানুষ
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার বেঁচে যাওয়া মানুষ এখন ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরে নিজেদের শেষ সম্বল খুঁজছেন।
নুয়াকোটের ৪৫ বছর বয়সী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শান্তা সুনার বলেন, তিনি ও তাঁর স্বামী এক পোশাকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়েছেন। তাঁদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তবে বেঁচে থাকাটাকেই তিনি সৌভাগ্য হিসেবে দেখছেন।
এদিকে বন্যায় বেঁচে যাওয়া শিশুদের মানসিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন। ভয়াবহ বন্যায় সহপাঠীদের হারানো, ঘরবাড়ি ধ্বংস হতে দেখা এবং প্রিয়জনদের হারানোর অভিজ্ঞতা অনেক শিশুর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
নিখোঁজ স্বজনদের প্রতীকী শেষকৃত্য
এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার অপেক্ষার পর অনেক পরিবার এখন কঠিন বাস্তবতা মেনে নিতে শুরু করেছে। মরদেহ না পেলেও নেপালের রাসুয়া ও কাঠমান্ডুতে হিন্দু রীতি অনুযায়ী খড়ের পুতুল তৈরি করে প্রতীকী শেষকৃত্য করা হচ্ছে।
অন্যদিকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্ত করতে কাঠমান্ডুর মর্গের সামনে ডিএনএ নমুনা দিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াচ্ছেন স্বজনেরা। তাঁদের আশা, শনাক্ত না হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে হয়তো পাওয়া যাবে প্রিয়জনের সন্ধান।
জলবায়ু ক্ষতিপূরণ চায় নেপাল
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি জোরালো করেছে নেপাল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খেনাল জানিয়েছেন, নেপাল শুধু ত্রাণ বা দান চায় না; তারা জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ চায়।
বিশ্ব উষ্ণায়নে বড় ভূমিকা রাখা দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে নেপাল কূটনৈতিকভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে। দেশটির দাবি, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে তুলনামূলক কম অবদান রেখেও নেপালকে ভয়াবহ জলবায়ু দুর্যোগের বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।