ইরান যুদ্ধের লক্ষ্য কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, এবার তেল-গ্যাসের দাম কমানোই অগ্রাধিকার
ইরান যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন শুরুতে যে কঠোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, সেগুলোর বেশির ভাগই এখন ধীরে ধীরে নমনীয় করা হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের অবস্থান থেকে সরে এসে তুলনামূলক কম কিছু অর্জনেই সন্তুষ্ট হতে চাইছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো যাতে বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারে। এর ফলে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের কম দামে তেল-গ্যাস সরবরাহ করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, তাঁর দুটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, উপসাগরীয় দেশগুলোকে বিশ্ব অর্থনীতিতে তেল ও গ্যাস সরবরাহের সুযোগ নিশ্চিত করা, যাতে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল থাকে। দ্বিতীয়ত, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের পুরোনো লক্ষ্যগুলোর মধ্যেও ছিল। তবে এবার মার্কিন জনগণের জন্য তেল ও গ্যাসের দাম কম রাখার বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা আগের লক্ষ্যগুলোর তালিকায় ছিল না।
ভ্যান্সের বক্তব্যের পরদিন হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলাইন লেভিটও বলেন, দুটি লক্ষ্যই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে গত মে মাসে মার্কিন জনগণের জন্য জ্বালানির দাম কম রাখার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে রাজি হননি ট্রাম্প। সে সময় তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যুদ্ধের কারণে মার্কিনিদের অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি তিনি বিবেচনায় নিচ্ছেন কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন, এ বিষয়ে তিনি ‘একটুও’ চিন্তিত নন। তাঁর কাছে ইরানের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গত শুক্রবারও ট্রাম্প বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তেল ও গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়লেও এ জন্য তিনি ক্ষমা চাইবেন না। তাঁর মতে, এই যুদ্ধের সঙ্গে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত।
ইরান যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আরও বিস্তৃত। এর মধ্যে ছিল ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস, বিমানবাহিনী অকার্যকর করা এবং কোথাও কোথাও নৌবাহিনী ধ্বংসের মতো লক্ষ্যও ছিল। সময়ের সঙ্গে এসব লক্ষ্য বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে।
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়াকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে এ যুদ্ধ থেকে ওয়াশিংটনের বড় কোনো অর্জন না পাওয়ার বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। ফলে এখন সেই পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করাই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাতারে ইরানি পাইলট নিয়ে বিতর্ক
এদিকে কাতারে দুই ইরানি পাইলট আটকা পড়েছেন বলে দাবি করেছে ইরান। তাদের বিষয়ে জানতে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলকে কাতারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। তবে কাতার এ দাবি অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের হেফাজতে কোনো ইরানি পাইলট নেই।
দোহা গত শনিবার জানিয়েছে, গত মার্চে কাতারের আকাশে প্রবেশ করা একটি ইরানি বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হওয়ার পর উদ্ধারকর্মীরা একজন পাইলটের দেহাবশেষের সন্ধান পেয়েছিলেন।
হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে তাদের চলমান আলোচনা খুব শিগগিরই ফলাফল দিতে পারে। তবে এই আলোচনা ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় বলে দাবি করেছেন তিনি।
আরাঘচির ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার মূল বিষয় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল। আগের নৌপথগুলো বর্তমানে কার্যকর না থাকায় বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে। আপাতত একটি সাময়িক পথ চালুর চেষ্টা চলছে, যা পরে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হতে পারে।
তবে ইরান-ওমান আলোচনার সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি রয়েছে। ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর কোনো ধরনের কর আরোপের পক্ষে নয়। অন্যদিকে, ইরান এই পথে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে।