ভরা মৌসুমেও মেঘনায় ইলিশের আকাল, হতাশ জেলে-ব্যবসায়ী; তদন্তে বিশেষজ্ঞ দল
দেশের অন্যতম প্রধান ইলিশ অভয়াশ্রম চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের আলেকজান্ডার পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার মেঘনা নদী। প্রতি বছরের জুলাই এলেই এই নদীপথ মুখর থাকত হাজারো মাছ ধরার নৌকা, আড়তে আড়তে ইলিশের বেচাকেনা আর ক্রেতাদের ভিড়ে। কিন্তু এবার ভরা মৌসুমেও সেই পরিচিত চিত্র নেই। কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় হতাশ জেলে, আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় জেলে ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জাটকা সংরক্ষণে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও অভিযান যথাযথভাবে পরিচালিত হয়নি। নিষিদ্ধ সময়ে অবাধে জাটকা নিধনের প্রভাবই এখন ভরা মৌসুমে ইলিশের উৎপাদনে পড়েছে বলে তাদের দাবি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রামগতি ও কমলনগর এলাকার মেঘনায় নিষেধাজ্ঞার সময় অবৈধ মাছ ধরার অভিযোগ ছিল ব্যাপক। পাশাপাশি জেলেদের জন্য সরকার নির্ধারিত ভিজিএফ চাল বিতরণ এবং অভিযান পরিচালনায়ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
মাতাব্বরহাট মাছঘাটের এক আড়তদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নিষিদ্ধ সময়ে এ বছর নদীতে নামমাত্র অভিযান হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা দরকার।”
জেলেরা জানান, দিন-রাত নদীতে জাল ফেলেও পর্যাপ্ত ইলিশ মিলছে না। অনেকের নৌকার জ্বালানি খরচও উঠছে না। সরবরাহ কম থাকায় বাজারে যে অল্প ইলিশ আসছে, তার দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
তবে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু অভিযান নয়, প্রাকৃতিক পরিবর্তনও ইলিশ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। কমলনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তূর্য সাহা এবং লক্ষ্মীপুর জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জসিম উদ্দিনের ভাষ্য, মাঝ নদীতে নতুন ডুবোচর জেগে ওঠায় আগের মতো ইলিশ এ এলাকায় প্রবেশ করতে পারছে না।
এদিকে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমান–এর নেতৃত্বে পরিচালিত এ গবেষণায় সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)-এর বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত রয়েছেন।
আনিসুর রহমান বলেন, সরকারের সংরক্ষণ অভিযান দুর্বল হলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, ডুবোচর সৃষ্টি, সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং সাগরের নোনাজলের প্রভাবসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণও ইলিশের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।