ঢাকা    শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩
আর টি এন নিউজ ২৪

মাটির স্কুলে বদলে যাচ্ছে গ্রামের ভবিষ্যৎ


প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

মাটির স্কুলে বদলে যাচ্ছে গ্রামের ভবিষ্যৎ
পাহাড়িয়াপাড়া গ্রামের শিশুদের মাঝে ‘আগামীর স্কুল’ যেন এক বাতিঘর

মাটির স্কুলে বদলে যাচ্ছে গ্রামের ভবিষ্যৎ

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পাহাড়িয়াপাড়া। স্থানীয় বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় সেখানে। বর্ষাকালে কর্দমাক্ত রাস্তায় হাঁটাও হয়ে ওঠে কষ্টসাধ্য। দীর্ঘদিন এই গ্রামের শিশুদের জন্য কাছাকাছি কোনো বিদ্যালয় ছিল না। ফলে অনেক শিশুই বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে দেরি করত, কেউ কেউ শিক্ষার সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হতো।

সেই বাস্তবতা বদলাতে শুরু করেছে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। গ্রামের মানুষের স্বপ্ন, স্থানীয় তরুণদের প্রচেষ্টা এবং একটি সামাজিক সংস্থার সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে মাটির তৈরি বিদ্যালয় ‘আগামীর স্কুল’। ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই স্কুল এখন পাহাড়িয়াপাড়ার শিশুদের শিক্ষার প্রধান আশ্রয়স্থল।

বাঁশ, মাটি ও স্থানীয় উপকরণ দিয়ে নির্মিত বিদ্যালয়টিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে অন্যরকম পরিবেশ। মাটির দেয়াল, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি যেন শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনন্য শিক্ষাঙ্গন তৈরি করেছে। শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা নেই। খোলা মাঠে খেলাধুলা আর আনন্দময় শিক্ষার মধ্য দিয়ে দিন কাটে শিশুদের।

তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার বলে, “এই স্কুলে গরম লাগে না। পড়াশোনা শেষে আমরা মাঠে খেলতে পারি, খুব ভালো লাগে।”

গ্রামবাসীদের সঙ্গে কাজ করা গ্রো ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশন–এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া জাফরিন বলেন, পাহাড়িয়াপাড়ার মতো নদীতীরবর্তী অঞ্চলে স্থানীয় ঐতিহ্য ও জলবায়ুবান্ধব চিন্তা মাথায় রেখেই বিদ্যালয়টি নির্মাণ করা হয়েছে। বাইরে থেকে কোনো সমাধান চাপিয়ে না দিয়ে গ্রামের মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন গ্রামের কয়েকজন তরুণ। শিক্ষক সেলিম আহমেদ, সুমন মিয়া ও রেহানা আক্তার একসময় বিভিন্ন স্থানে কাজ করলেও গ্রামের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিয়ে ভাবতেন। পরে সবার সহযোগিতায় স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।

শিক্ষক সেলিম আহমেদ বলেন, “আগে অনেক শিশু বিদ্যালয়ে যেত না। এখন তারা নিয়মিত স্কুলে আসে। অভিভাবকরাও সন্তুষ্ট।”

স্থানীয় কারিগর ও গ্রামবাসীদের সম্মিলিত শ্রমে নির্মিত বিদ্যালয়টির নকশা করেছে স্থপতি প্রতিষ্ঠান ‘পারসিভড’। নির্মাণকাজে নেতৃত্ব দেন ৮০ বছর বয়সী কারিগর গফুর মিয়া। তাঁর কাছ থেকে ঐতিহ্যবাহী মাটির স্থাপনা নির্মাণের কৌশলও শিখেছেন গ্রামের তরুণরা।

বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৭৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। রয়েছে চার শতাধিক বইয়ের ‘স্কোয়াড্রন লিডার শাফায়াত স্মৃতি গ্রন্থাগার’। বই পড়া, গল্প শোনা এবং সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে শিশুরা।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করায় নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও কমেছে। মাটির ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের তুলনায় কয়েক ডিগ্রি কম থাকায় গরমেও শিক্ষার্থীরা স্বস্তিতে পাঠ নিতে পারে।

একসময় যে গ্রামে শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, সেই পাহাড়িয়াপাড়াতেই এখন প্রতিদিন ভেসে আসে শিশুদের কবিতা আবৃত্তি আর পাঠের শব্দ। গ্রামের মানুষের আশা, এই মাটির স্কুল থেকেই একদিন গড়ে উঠবে নতুন প্রজন্মের আলোকিত ভবিষ্যৎ।

বিষয় : পরিবেশ

আর টি এন নিউজ ২৪

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬


মাটির স্কুলে বদলে যাচ্ছে গ্রামের ভবিষ্যৎ

প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬

featured Image

মাটির স্কুলে বদলে যাচ্ছে গ্রামের ভবিষ্যৎ

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পাহাড়িয়াপাড়া। স্থানীয় বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় সেখানে। বর্ষাকালে কর্দমাক্ত রাস্তায় হাঁটাও হয়ে ওঠে কষ্টসাধ্য। দীর্ঘদিন এই গ্রামের শিশুদের জন্য কাছাকাছি কোনো বিদ্যালয় ছিল না। ফলে অনেক শিশুই বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে দেরি করত, কেউ কেউ শিক্ষার সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হতো।

সেই বাস্তবতা বদলাতে শুরু করেছে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। গ্রামের মানুষের স্বপ্ন, স্থানীয় তরুণদের প্রচেষ্টা এবং একটি সামাজিক সংস্থার সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে মাটির তৈরি বিদ্যালয় ‘আগামীর স্কুল’। ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই স্কুল এখন পাহাড়িয়াপাড়ার শিশুদের শিক্ষার প্রধান আশ্রয়স্থল।

বাঁশ, মাটি ও স্থানীয় উপকরণ দিয়ে নির্মিত বিদ্যালয়টিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে অন্যরকম পরিবেশ। মাটির দেয়াল, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি যেন শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনন্য শিক্ষাঙ্গন তৈরি করেছে। শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা নেই। খোলা মাঠে খেলাধুলা আর আনন্দময় শিক্ষার মধ্য দিয়ে দিন কাটে শিশুদের।

তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার বলে, “এই স্কুলে গরম লাগে না। পড়াশোনা শেষে আমরা মাঠে খেলতে পারি, খুব ভালো লাগে।”

গ্রামবাসীদের সঙ্গে কাজ করা গ্রো ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশন–এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া জাফরিন বলেন, পাহাড়িয়াপাড়ার মতো নদীতীরবর্তী অঞ্চলে স্থানীয় ঐতিহ্য ও জলবায়ুবান্ধব চিন্তা মাথায় রেখেই বিদ্যালয়টি নির্মাণ করা হয়েছে। বাইরে থেকে কোনো সমাধান চাপিয়ে না দিয়ে গ্রামের মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন গ্রামের কয়েকজন তরুণ। শিক্ষক সেলিম আহমেদ, সুমন মিয়া ও রেহানা আক্তার একসময় বিভিন্ন স্থানে কাজ করলেও গ্রামের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিয়ে ভাবতেন। পরে সবার সহযোগিতায় স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।

শিক্ষক সেলিম আহমেদ বলেন, “আগে অনেক শিশু বিদ্যালয়ে যেত না। এখন তারা নিয়মিত স্কুলে আসে। অভিভাবকরাও সন্তুষ্ট।”

স্থানীয় কারিগর ও গ্রামবাসীদের সম্মিলিত শ্রমে নির্মিত বিদ্যালয়টির নকশা করেছে স্থপতি প্রতিষ্ঠান ‘পারসিভড’। নির্মাণকাজে নেতৃত্ব দেন ৮০ বছর বয়সী কারিগর গফুর মিয়া। তাঁর কাছ থেকে ঐতিহ্যবাহী মাটির স্থাপনা নির্মাণের কৌশলও শিখেছেন গ্রামের তরুণরা।

বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৭৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। রয়েছে চার শতাধিক বইয়ের ‘স্কোয়াড্রন লিডার শাফায়াত স্মৃতি গ্রন্থাগার’। বই পড়া, গল্প শোনা এবং সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে শিশুরা।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করায় নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও কমেছে। মাটির ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের তুলনায় কয়েক ডিগ্রি কম থাকায় গরমেও শিক্ষার্থীরা স্বস্তিতে পাঠ নিতে পারে।

একসময় যে গ্রামে শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, সেই পাহাড়িয়াপাড়াতেই এখন প্রতিদিন ভেসে আসে শিশুদের কবিতা আবৃত্তি আর পাঠের শব্দ। গ্রামের মানুষের আশা, এই মাটির স্কুল থেকেই একদিন গড়ে উঠবে নতুন প্রজন্মের আলোকিত ভবিষ্যৎ।


আর টি এন নিউজ ২৪

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আহসান উল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আর টি এন নিউজ ২৪
মাটির স্কুলে বদলে যাচ্ছে গ্রামের ভবিষ্যৎ
0:00 0:00
1.0x